:

চুয়েটে: তালা ভেঙে উপাচার্যের প্রবেশ, অবরুদ্ধ করে ভবনে তালা ও বাসে হামলা

top-news

চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) নবনিযুক্ত উপাচার্য অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলমের নিয়োগ বাতিল এবং সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনর্বহালের দাবিতে চলমান আন্দোলন সোমবার (১২ অক্টোবর) নাটকীয় ও সংঘাতময় রূপ নিয়েছে।

প্রশাসনিক ভবনের তালা ভেঙে নতুন উপাচার্যের দপ্তরে প্রবেশ, শিক্ষার্থীদের বাসে হামলা, মারধর এবং পাল্টা পদক্ষেপে উপাচার্যকে ভেতরে রেখেই উপাচার্য ভবনে তালা ঝুলিয়ে দেওয়ার ঘটনায় ক্যাম্পাসে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বহিরাগতদের নিয়ে ক্যাম্পাসে প্রবেশের প্রতিবাদে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী সমিতি পূর্ণ কর্মবিরতি ও সর্বাত্মক অসহযোগ কর্মসূচি অব্যাহত রাখার কঠোর ঘোষণা দিয়েছে।

ঘটনার সূত্রপাত হয় সোমবার সকাল পৌনে ৮টার দিকে। ইউজিসির সভায় অংশ নিতে ঢাকায় অবস্থানের কথা থাকলেও সবাইকে চমকে দিয়ে হঠাৎ ক্যাম্পাসে পৌঁছান নবনিযুক্ত উপাচার্য অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলম। আন্দোলনরত শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের দেওয়া তালা ভেঙে প্রশাসনিক ভবন-২-এ নিজ দপ্তরে প্রবেশ করেন তিনি।

প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, এ সময় চুয়েট শাখা ছাত্রদলের সভাপতি ওয়াসিফ রাশেদ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবু সুফিয়ান আল সাবিত ও সাংগঠনিক সম্পাদক বিপ্লব হোসাইনসহ ৮ থেকে ১০ জন নেতাকর্মী তাঁর সঙ্গে ছিলেন।

নতুন উপাচার্যকে ভেতরে রেখে শিক্ষার্থীরা তাৎক্ষণিকভাবে ভবনটি ছেড়ে দেওয়ার জন্য দুপুর ১২টা পর্যন্ত সময় বেঁধে দেন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তিনি কার্যালয় না ছাড়ায় দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা ‘তালা, তালা, তালা হবে, ভিসি ভবন তালা হবে’ এবং ‘প্রত্যাখ্যান, প্রত্যাখ্যান, অনলাইন ভিসি প্রত্যাখ্যান’ স্লোগানে উপাচার্যকে ভেতরে রেখেই ভবনের ফটকে তালা ঝুলিয়ে দেন।

ক্যাম্পাসের এই উত্তেজনার মধ্যেই দুপুর আড়াইটার দিকে হাটহাজারীর মদুনাঘাট এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বাসে হামলার ঘটনা ঘটে। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের বহনকারী বাসটি থামিয়ে যন্ত্রকৌশল বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আমিনুল কুদ্দুস চৌধুরীকে মারধর ও লাঞ্ছিত করা হয়।

ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর অভিযোগ, বাস থেকে নামার পর মোবাইল বের করতেই একদল লোক তাঁকে ঘিরে ধরে ছাত্রলীগ ও শিবিরের ট্যাগ দিয়ে জামাকাপড় ছিঁড়ে ফেলে এবং মারধর করে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চালায়। পরবর্তীতে স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় তিনি রক্ষা পান। সাধারণ শিক্ষার্থীদের দাবি, স্থানীয় ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা এই হামলায় সরাসরি জড়িত।

এই ন্যক্কারজনক হামলার প্রতিবাদে এবং শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার দাবিতে বিকেলে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের সামনে যৌথ মানববন্ধনের ডাক দেন বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীরা।

এদিকে বাসে হামলার প্রতিবাদ এবং উপাচার্যের তালা ভেঙে প্রবেশের ঘটনায় সোমবার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় অডিটোরিয়ামে শিক্ষক সমিতি, কর্মকর্তা সমিতি ও কর্মচারী সমিতির যৌথ সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভা শেষে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়, যা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে গিয়ে শেষ হয়।

সেখানে শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আহসান উল্লাহ, সাধারণ সম্পাদক ড. মো. আবুল হাছান, যুগ্ম সম্পাদক মো. সামিউন বাসির এবং কর্মচারী সমিতির সভাপতি জামাল উদ্দিন বক্তব্য দেন। নেতারা জানান, শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনায় হাটহাজারী থানা ও বিভাগীয় কমিশনারকে অবহিত করা হয়েছে এবং ২৪ ঘণ্টার মধ্যে হামলাকারীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়।

সমাবেশ শেষে প্রকাশিত যৌথ বিবৃতিতে তিন সমিতি জানায়, বহিরাগতদের সঙ্গে নিয়ে উপাচার্যের এমন জোরপূর্বক ক্যাম্পাসে প্রবেশ তারা ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করছে এবং এর ফলে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে তার সম্পূর্ণ দায়ভার উপাচার্যকেই বহন করতে হবে।

একই সঙ্গে পূর্বঘোষিত দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের পূর্ণ কর্মবিরতি ও সর্বাত্মক অসহযোগ অব্যাহত থাকবে।

উল্লেখ্য, গত ২১ সেপ্টেম্বর দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র ৫৬ দিনের মাথায় সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে আকস্মিক অপসারণ করে অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলমকে নিয়োগ দেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়।এর প্রতিবাদে ২২ সেপ্টেম্বর থেকে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি পালন করে আসছেন শিক্ষার্থীরা।

শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের একযোগে কর্মবিরতির কারণে টানা তিন সপ্তাহ ধরে চুয়েটের সব ধরনের শিক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়েছে। আজকের ঘটনাপ্রবাহ সেই অচলাবস্থাকে আরও গভীর ও সংঘাতপূর্ণ সংকটের দিকে ঠেলে দিল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *